১৯৯৬-২০০১ ছিল জ্বালানি-বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নের স্বর্ণযুগের শুরু
এমএ আরাফাত
হাকিকুল ইসলাম খোকন,বাপসনিইজঃ
সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের
কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য মোহাম্মাদ আলী আরাফাত বলেছেন,বাংলাদেশের দীর্ঘ ৫৫ বছরের ইতিহাসে ১৯৯৬-২০০১ সাল ছিল জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নের এক নতুন যুগের সূচনা। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে স্বল্প সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করে। এর ফলে ১৯৯৭-৯৮ সালেই জ্বালানি নিরাপত্তা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে দৃশ্যমান সাফল্য অর্জিত হয়।
এর আগে ১৯৯১-৯৬ সালে বিএনপি সরকারের সময়ে দুর্বল ব্যবস্থাপনা ও অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নাজুক অবস্থায় পৌঁছেছিল। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ উপেক্ষা করে বাখরাবাদ ও ফেনী গ্যাসক্ষেত্র থেকে মাত্রাতিরিক্ত গ্যাস উত্তোলনের ফলে এসব গ্যাসক্ষেত্রে উৎপাদন কমে যায়। একই সময়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন আশুগঞ্জ-বাখরাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন পাইপলাইন নির্মাণকাজ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
ফলে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ উদ্বৃত্ত গ্যাস থাকা সত্ত্বেও তা চট্টগ্রাম অঞ্চলে সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছিল না। এর প্রভাব পড়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সার কারখানাগুলোর ওপর। চট্টগ্রাম অঞ্চলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সার উৎপাদন মারাত্মক সংকটে পড়ে। একই সময়ে দেশজুড়ে প্রতিদিন ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং জনজীবনে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি করে।
শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর পরিস্থিতি পরিবর্তনে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়। দ্রুততম সময়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে ১৯৯৭-৯৮ সালেই জ্বালানি নিরাপত্তা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে দৃশ্যমান সাফল্য আসে।
-/গ্যাস সঞ্চালন ও জ্বালানি নিরাপত্তায় বড় পরিবর্তন/-
৫৮ কিলোমিটার দীর্ঘ আশুগঞ্জ-বাখরাবাদ ক্রস-কান্ট্রি গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণের মাধ্যমে দেশের পূর্বাঞ্চলে গ্যাস সঞ্চালন গ্রিডের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগ স্থাপন করা হয়। এর ফলে ১৯৯৭ সালেই চট্টগ্রাম অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ বৃদ্ধি পায় এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সার কারখানাগুলোর উৎপাদন স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
একই সময়ে বঙ্গবন্ধু যমুনা বহুমুখী সেতু বরাবর পাইপলাইন নির্মাণসহ এলেঙ্গা থেকে হাটিকুমরুল ও বাঘাবাড়ী পর্যন্ত গ্যাস সঞ্চালন পাইপলাইন নির্মাণ করা হয়। এর মাধ্যমে দেশের পশ্চিমাঞ্চলেও গ্যাস সঞ্চালন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
সালদা, মেঘনা ও বিয়ানীবাজার গ্যাসক্ষেত্রকে জাতীয় গ্যাস গ্রিডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়। পাশাপাশি সাঙ্গু অফশোর গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন করে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা হয়। জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্রও উন্নয়ন করে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সংযুক্ত করা হয়। এ সময় মৌলভীবাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয় এবং পরবর্তী সময়ে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্রও দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে সামনে আসে।
এসব উদ্যোগের ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে গ্যাস সরবরাহের ভারসাম্য তৈরি হয় এবং বিদ্যুৎ, সার ও শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহের সক্ষমতা বাড়তে থাকে।
-/বিদ্যুৎ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের নতুন দিগন্ত/-
বিদ্যুৎ খাতেও ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে নেওয়া উদ্যোগ ছিল যুগান্তকারী। Private Sector Power Generation Policy-এর আওতায় মেঘনাঘাটে ৪২০ মেগাওয়াট এবং হরিপুরে ৩৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার আইপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এডিবির অর্থায়নে বাস্তবায়িত এসব আইপিপি পরবর্তীতে বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের আদর্শ মডেল হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পায়।
এ সময় বার্জ-মাউন্টেড পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনের মতো ব্যতিক্রমী উদ্যোগও নেওয়া হয়। পাশাপাশি গ্যাস গ্রিডের সন্নিহিত এলাকায় ১১ মেগাওয়াট ক্ষমতার ক্ষুদ্র আইপিপি স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ফলে বিদ্যুৎ খাতে লোডশেডিং কমিয়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার পথে বড় অগ্রগতি হয়। ২০০১ সাল নাগাদ ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৫২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়েছিল।
অর্থাৎ, ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতকে আলাদাভাবে না দেখে সমন্বিতভাবে উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। গ্যাস অনুসন্ধান, গ্যাস সঞ্চালন, জাতীয় গ্রিড সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং বেসরকারি বিনিয়োগ—সবকিছুকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনা হয়।
ফলে ২০০১ সালে এসে দেশের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত একটি তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ও সক্ষম অবস্থানে পৌঁছেছিল। ১৯৯৬ সালে যে খাত ছিল তীব্র সংকট, লোডশেডিং ও জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তায় জর্জরিত, পাঁচ বছরের ব্যবধানে সেই খাতেই তৈরি হয়েছিল উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের একটি শক্ত ভিত্তি।
তবে ২০০১ সালের পর বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও প্রয়োজনীয় নতুন বিনিয়োগের ঘাটতির কারণে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের সেই অগ্রগতির ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে পরবর্তী কয়েক বছরে আবারও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট তীব্র হয়ে ওঠে।









